২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী করপোরেটদের ঋণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ সময় বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন বা ৮ লাখ কোটি ডলারের ঋণ সংগ্রহ করেছে। এ সময় করপোরেট বন্ড ও লিভারেজড লোনের চাহিদা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মূলত স্বল্প সুদহার কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য বিপুল পরিমাণ পুঁজি সংগ্রহ করেছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। কিছু ঝুঁকির আভাসসহ নতুন বছরে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের। এ পূর্বাভাসের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকেও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর করপোরেট বন্ড ও লিভারেজড ঋণ ইস্যুর পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৯৩ ট্রিলিয়নে পৌঁছেছে। সরকারি ঋণের তুলনায় এ ধরনের ঋণের সুদহার গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌছায়। অ্যাবভি ও হোম ডিপোর মতো বড় কোম্পানিগুলো এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় অংকের ঋণ সংগ্রহ করেছে।
কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী সময়ে করপোরেট খাতে ঋণ গ্রহণ ২০২১ সালে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। চলতি বছর ওই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। করপোরেট বন্ড ও লিভারেজড ঋণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বাড়ায় সুদহার কমে যায়। ফেডারেল রিজার্ভসহ অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানো শুরু করার আগেই এসব ঋণের সুদহার কমে গিয়েছিল।
সিটি গ্রুপের উত্তর আমেরিকার ডেট ক্যাপিটাল মার্কেট বিভাগের প্রধান জন ম্যাকওলে বলেন, ‘বাজারের প্রতিটি দিকই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে।’
ব্যাংকাররা বলছেন, গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সুদহার পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে চাচ্ছিল। ওই সময় বিদ্যমান নিম্ন সুদহারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই ঋণ গ্রহণ সম্পন্ন করতে আগ্রহীও ছিল তারা। নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জোরালো বিজয়ের পর সুদহার আরো কমানো হয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি তাদের পরবর্তী বছরের ঋণ গ্রহণের চাহিদাও আগেভাগে পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির ফিক্সড ইনকাম ক্যাপিটাল মার্কেটসের সহপ্রধান ট্যামি সের্বি বলেন, ‘প্রথমে চলতি বছর স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহণ নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল কোম্পানিগুলো। পরে সুদহার কমায় ঋণ গ্রহণের সার্বিক পরিবেশ আরো অনুকূলে আসে। এতে আগামী বছরের জন্য ঋণ গ্রহণ নিশ্চিত করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।’
ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যালস জায়ান্ট অ্যাবভি ফেব্রুয়ারিতে দেড় হাজার কোটি ডলারের ঋণ সংগ্রহ করেছিল। ইমিউনোজেন ও সেরেভেল থেরাপিউটিকস অধিগ্রহণের জন্য এ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের অন্য বড় ঋণ ইস্যুকারীদের মধ্যে ছিল সিসকো সিস্টেমস, ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ ব্রিস্টল মেয়ার্স স্কুইব, বিপর্যস্ত এয়ারস্পেস জায়ান্ট বোয়িং ও রিটেইলার হোম ডিপো।
ব্যাংক অব আমেরিকার তথ্যানুযায়ী, মার্কিন নির্বাচনের পর ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড ও সরকারি বন্ডের ইল্ডের (মুনাফা) পার্থক্য (স্প্রেড) মাত্র দশমিক ৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে আসে, যা নব্বইয়ের দশকের পর সবচেয়ে কম। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর এটি সামান্যই বেড়েছে। যদিও তা ১৭ বছরের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি রয়ে গেছে।
স্প্রেড কম থাকা সত্ত্বেও করপোরেট ঋণ গ্রহণের খরচ এখনো তুলনামূলক বেশি। এর প্রধান কারণ সরকারি বন্ডের ইল্ডের উচ্চহার। ব্যাংক অব আমেরিকার তথ্যানুযায়ী, ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড করপোরেট ঋণের বর্তমান ইল্ড ৫ দশমিক ৪, যা তিন বছর আগে ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
তুলনামূলক উচ্চ ইল্ডের কারণে করপোরেট ঋণের প্রতি বড় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বেড়েছে। চলতি বছর বিশ্বব্যাপী করপোরেট বন্ড ফান্ডে প্রায় ১৭ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা ইপিএফআরের তথ্যানুযায়ী একটি নতুন রেকর্ড।
ব্যাংক অব আমেরিকার ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড সিন্ডিকেটের প্রধান ড্যান মিড বলেন, ‘২০২০ সালের ব্যতিক্রম ছাড়া এ বছর ছিল করপোরেট ঋণ গ্রহণের সবচেয়ে ব্যস্ততম বছর। ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর ফলে দেয়া সরকারি উদ্দীপনার কারণে ঋণ ইস্যুর পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক মাসে ঋণ গ্রহণের বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। প্রত্যেক মাসে প্রকৃত সরবরাহ আমাদের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে।’
অনেক ব্যাংকার মনে করছেন, মহামারীর সময় নেয়া স্বল্প সুদের ঋণ পুনর্গঠনের কারণে ২০২৫ সালেও ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকবে। তবে জেপি মরগ্যানের ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড ফাইন্যান্সের গ্লোবাল কো-হেড মার্ক বেইগনিরেস বলেন, ‘আগামী বছর ঋণ গ্রহণের কার্যক্রম স্থিতিশীল থাকবে। তবে বড় মাপের ও ঋণনির্ভর অধিগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে কিছু ব্যাংকার সতর্ক করেন, স্প্রেড যদি বর্তমান স্তর থেকে উল্লেখযোগ্য হারে প্রসারিত হয়, করপোরেট ঋণ গ্রহণের এ উন্মাদনা ধীর হতে পারে।
ওয়েলস ফার্গোর হাই-গ্রেড ডেবট সিন্ডিকেটের গ্লোবাল প্রধান মৌরিন ও’কনর বলেন, ‘বর্তমান বাজারে প্রায় কোনো ধরনের ঝুঁকি বিবেচনা করা হচ্ছে না। স্প্রেড এতটাই নিখুঁতভাবে নির্ধারণ হয়েছে যে এতে ব্যক্তিগত বা অনিয়মিত ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।’